দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে। চলতি বছরে মশাবাহিত এই রোগে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে মশা নিধনে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নেই কোনো আধুনিক সরঞ্জাম, নেই কীটনাশক, নেই মাঠপর্যায়ে কাজ করার সক্ষমতা। অথচ এ দপ্তরের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯২ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বাজেট দলিল পর্যালোচনা করে জানা গেছে, এ দপ্তরের জন্য বরাদ্দ রাখা অর্থের পুরোটা যাচ্ছে অফিস পরিচালনা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ। মশা মারার ওষুধ বা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। নেই কোনো গবেষণাগার বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও।
১৯৪৮ সালে রাজধানীর লালবাগে এক একর ৩৯ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সময় ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এলেও ১৯৮৪ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ হয়। ২০১১ সালের পর থেকে আর কোনো নতুন নিয়োগ না হওয়ায় কর্মীসংকটও প্রকট। বর্তমানে দপ্তরটিতে ২০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও বেশিরভাগই অফিস প্রশাসনে।
দপ্তরের মাঠপর্যায়ের জনবল বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে যুক্ত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০৬ জন, দক্ষিণে ৭৫ জন কর্মরত রয়েছেন। তবে তারা সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা ছাড়া নিজেরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন না।
ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কাজ মশা নিধন হলেও হাতে নেই ওষুধ, নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। মাঠে কাজ করতে গেলেও সিটি করপোরেশনের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দপ্তরটিকে কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, “২০১৯ সালে আমি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম—এই দপ্তরটিকে ন্যাশনাল ভেক্টর কন্ট্রোল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের। কিছু সভা-সেমিনার হলেও আর অগ্রগতি হয়নি।”
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “এই দপ্তরটিকে সক্রিয় করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কেবল বরাদ্দ দিয়ে কিছু হবে না, পরিকল্পনা ও গবেষণার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।”
ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
জাতীয় ডেস্ক 
















